ব্রহ্মপুত্রে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চীনের প্রবৃদ্ধিতে গতি ফেরাতে পারবে কি

ইয়ালুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্র) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে সম্প্রতি ‘শতাব্দীর শীর্ষ প্রকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং।

ইয়ালুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্র) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে সম্প্রতি ‘শতাব্দীর শীর্ষ প্রকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টিকারী প্রকল্প ও সবুজ জ্বালানিনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রকল্পটিকে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পশ্চিম চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সহায়তার পাশাপাশি এর রয়েছে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব।

যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের জায়গা থেকে প্রকল্পটিকে চীনের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখা হলেও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তা ভূমিকা রাখতে পারে সামান্যই।

উচ্চাভিলাষী এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ১৬৮ বিলিয়ন ডলার। মাস তিনেক আগে বাঁধ নির্মাণ উদ্বোধনকালে লি কিয়াং বলেন, ‘প্রকল্পটি হবে ব্যাপক পরিসরের, দীর্ঘস্থায়ী ও বড় ধরনের প্রভাবশালী।’

চীনের অর্থনীতিকে এখন নানামুখী সংকটের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সম্পত্তি খাতে ধস, মার্কিন শুল্কচাপ ও ভোক্তা চাহিদা হ্রাসের বিপরীতে অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে সৃষ্ট মূল্যসংকোচন ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বাণিজ্যিক উত্তেজনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে দেশটিকে। করপোরেট খাতের সতর্ক অবস্থান দেশটির কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এমন পরিস্থিতিতে তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে যাচ্ছে চীন। কেউ কেউ মনে করেন, এর প্রকৃত নির্মাণকাজ হয়তো এক-দুই বছর আগেই শুরু হয়েছিল। চীনের অর্থনীতির প্রতি আস্থা জোরদার করার জন্যই এটি উদ্বোধনের জন্য গত জুলাইকে নির্বাচন করা হয়েছিল।

আগামী সপ্তাহে ২০৩০ পর্যন্ত কার্যকর নতুন জাতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নির্ধারণ করবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন পরিকল্পনায় আত্মনির্ভরতা ও সবুজ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটির ক্ষেত্রেও এ দুই বিষয়কেই সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।

‘আন্তর্জাতিক পরিবেশ ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে’ উল্লেখ করে সম্প্রতি চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির সদস্য লি দাওকুই বলেন, ‘ইয়ালুং সাংপো প্রকল্প ও পশ্চিম চীনের অন্যান্য অবকাঠামো উদ্যোগ হলো কৌশলগত জাতীয় লক্ষ্য। এটি অনুন্নত পশ্চিমাঞ্চলকে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করবে, দেশীয় অর্থনীতির বাধাগুলো দূর করবে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা আরো বাড়াবে।’

চীনের আরেক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থ্রি গর্জেস ড্যামের সঙ্গে নতুন প্রকল্পকে তুলনা করছেন কোনো কোনো পর্যবেক্ষক। থ্রি গর্জেস সক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি ১৯৯০ ও ২০০০ দশকে এশিয়ার আর্থিক সংকটকালে নির্মাণ হয়েছিল। উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যয়ের বিচারে থ্রি গর্জেসের তুলনায় তিন-চার গুণ বড় ইয়ালুং সাংপো প্রকল্প। আবার চীনের অর্থনীতিও আগের তুলনায় অনেক বড়। কিছু অর্থনীতিবিদ প্রশ্ন তুলছেন, এত বিশাল প্রকল্পও কি চীনের প্রবৃদ্ধিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে? নাকি স্বীকার করে নিতে হবে অর্থনীতিতে অবকাঠামো ব্যয় আগের মতো কার্যকর নয়?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পরিষেবার প্রসারের সঙ্গে চীনসহ সারা বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। এমন অবস্থায় ইয়ালুং সাংপো প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশটির ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় সহজেই ক্রেতা পাবে। পাশাপাশি এ প্রকল্প চীনকে বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর কৌশলগত সুবিধাও দিতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, বছরে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ইয়ালুং সাংপো, যা চীনের আবাসিক খাতে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশের সমতুল্য। নির্মাণ ও পরিচালনায় প্রয়োজন হবে লক্ষাধিক কর্মী। নির্মাণে লাগবে প্রায় চার কোটি টন সিমেন্ট ও কমপক্ষে ৪০ লাখ টন ইস্পাত। বাঁধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর থেকে চীনা সিমেন্ট কোম্পানি, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক ও প্রকৌশল কোম্পানির শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে উচ্ছ্বসিত বাজার বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিগওয়ান ল্যাবের ডাটা ম্যানেজার অ্যাম্বার ঝাংয়ের মতে, ‘থ্রি গর্জেস ড্যাম চীনের জাতীয় গৌরবের শক্তিশালী প্রতীক ও অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির যুগের অগ্রদূত হয়ে উঠেছিল। ইয়ালুং সাংপো আরো বৃহৎ ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। এটি একইভাবে নতুন ‘সুপার-সাইকেল’ প্রবৃদ্ধির যুগ সূচনা করতে পারে।’

হংকংভিত্তিক হেজ ফান্ড লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হাও হং প্রকল্পটিকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের হুভার ড্যামের সঙ্গে তুলনা করছেন, যেটি ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার সময় বিপুল কর্মসংস্থান ও চাহিদা তৈরি করেছিল। তিনি পূর্বাভাস দেন, ‘এ প্রকল্পের কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি উৎপাদকদের মুনাফা মার্জিন বাড়াবে এবং ভোক্তাদের মূল্যসংকোচনের ভয় কমাবে। উৎপাদনকারীরা বেশি কর্মী নিয়োগ দেবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে মানুষের আয় ও ব্যয় দুটোই বাড়বে। যদি সবকিছু ঠিকঠাক চলে, তাহলে মূল্য ও প্রবৃদ্ধির এক ইতিবাচক চক্র চীনের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে।’

আবার অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সংকটকালে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতি চাঙা করার পদ্ধতি বেইজিংয়ের জন্য পরীক্ষিত পথ। ইয়ালুং সাংপো প্রকল্পেও সেখান থেকে বেরোতে পারছে না চীন। যদিও অনেক দিন ধরেই দেশটির প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভোক্তাব্যয়ের ওপর মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

যেভাবে বলা হচ্ছে, এ প্রকল্প চীনের অর্থনীতিতে সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নোমুরার লু টিং, সিটিগ্রুপের জিয়াংরং ইউ ও ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের লিয়া ফাহির মতো বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইয়ালুং সাংপো প্রকল্প প্রাথমিক পর্যায়ে চীনের জিডিপিতে বার্ষিক মাত্র দশমিক ১ শতাংশ ভূমিকা রাখবে।

ম্যাককয়ার গ্রুপের চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু যোগ করেন, ‘আমরা মনে করি না, কোনো নদীতে একটি মেগা বাঁধ নির্মাণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার আরেকটি ধাপ হতে পারে।’

প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের পরিমাণও চীনা বাজারের বিশালতার তুলনায় উল্লেখযোগ্য কিনা, এমন প্রশ্ন তুলেছেন মর্নিংস্টারের জেফ ঝাংয়ের মতো বিছু বিশ্লেষক।

সুইস ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ারের গবেষণা বিভাগে প্রধান কারস্টেন মেন বলেন, ‘প্রথম দৃষ্টিতে ৪০-৬০ লাখ টন ইস্পাত ও তিন-পাঁচ কোটি টন সিমেন্ট বিশাল মনে হতে পারে। কিন্তু বিগত এক দশকে চীনের নির্মাণ খাতের আয়তন বিবেচনায় বলা যায়, এটি দেশটির বিশাল বাজারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে না।’ —নিক্কেই এশিয়া অবলম্বনে

আরও